
আজ ১২ই রবিউল আউয়াল, সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও আনন্দঘন দিন, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। এই দিনে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পৃথিবীতে শুভাগমন ঘটেছিল। দিনটি একদিকে যেমন আনন্দের, তেমনই তাঁর জীবন ও আদর্শকে নতুন করে অনুধাবন করার।
প্রতি বছর এই দিনকে ঘিরে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। একই সাথে, অনলাইন জগতে এই দিনটি নিয়ে মানুষের জানার আগ্রহের কোনো কমতি থাকে না। ঈদে মিলাদুন্নবী কী, এটি কেন পালন করা হয়, এর ইতিহাস ও তাৎপর্য কী, এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খায় মানুষের মনে। চলুন, এই বিষয়গুলো নিয়েই বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আসলে কী?
‘ঈদে মিলাদুন্নবী’—এই আরবি শব্দগুচ্ছের মধ্যেই এর অর্থ নিহিত রয়েছে।
- ঈদ (عيد): এই আরবি শব্দের অর্থ আনন্দ, খুশি বা উৎসব।
- মিলাদ (ميلاد): এর অর্থ জন্ম, জন্মদিন বা জন্মকাল।
- নবী (نبي): নবী বা আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ।
সুতরাং, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) এর শাব্দিক অর্থ হলো নবীর জন্মের আনন্দ বা উৎসব। এই দিনে মুসলমানরা তাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পৃথিবীতে আগমনকে স্মরণ করে আনন্দ প্রকাশ করেন এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। হিজরি সনের তৃতীয় মাস রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখে এই দিবসটি সারা বিশ্বে পালিত হয়। এই একই দিনে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায়ও নিয়েছিলেন, যা দিনটিকে একাধারে আনন্দ ও বেদনার মিশ্র অনুভূতিতে পূর্ণ করে।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য
হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মের আগে আরবের সেই সময়টাকে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অন্ধকারের যুগ বলা হতো। গোত্রে গোত্রে সংঘাত, হানাহানি, সামাজিক অবিচার, নারীদের প্রতি অসম্মান এবং নৈতিক অবক্ষয় ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এমন এক ক্রান্তিকালে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশে মা আমিনার গর্ভে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর আগমন ছিল মানবজাতির জন্য এক বিশেষ রহমত বা আশীর্বাদ। তিনি পৃথিবীতে এসে তাওহিদ বা এক আল্লাহর বাণী প্রচার করেন এবং এমন এক জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যা শান্তি, ন্যায়বিচার, মানবতা ও নৈতিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁর দেখানো পথেই মানুষ অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আলোর সন্ধান পায়। তাই তাঁর জন্মদিনকে নিছক একটি জন্মোৎসব হিসেবে না দেখে, মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত বা অনুগ্রহ হিসেবে দেখা হয়। এই দিনটি সেই মহা অনুগ্রহকে স্মরণ করে আল্লাহ তা’আলার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনের প্রচলন
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নবীজি (সা.)-এর জীবদ্দশায় বা তাঁর সাহাবিদের (রা.) যুগে এই দিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসব হিসেবে পালিত হতো না। পরবর্তীতে, ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এবং বিভিন্ন মুসলিম শাসক ও আলেমদের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করার প্রচলন শুরু হয়। বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে দিনটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালিত হয়। বাংলাদেশেও দিনটি সরকারি ছুটির দিন এবং অত্যন্ত মর্যাদার সাথে পালিত হয়।
যেভাবে পালিত হয় দিনটি
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে:
- মিলাদ ও দোয়া মাহফিল: মসজিদে এবং বিভিন্ন স্থানে নবীজি (সা.)-এর জীবন ও কর্মের উপর আলোচনা, দরুদ পাঠ এবং দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনা করে দোয়া করা হয়।
- সিরাত আলোচনা: নবীজি (সা.)-এর পূর্ণাঙ্গ জীবন বা ‘সিরাত’ নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়, যা থেকে মানুষ তাঁর আদর্শ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে।
- জশনে জুলুস (শোভাযাত্রা): নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে অনেকে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা বের করেন।
- দান-সদকা: গরিব-দুঃখীদের মধ্যে খাবার ও বস্ত্র বিতরণ করা হয়।
- নফল ইবাদত: অনেকে এই দিনে নফল রোজা রাখেন এবং অন্যান্য ইবাদতে মশগুল থাকেন।
প্রকৃত শিক্ষা ও করণীয়
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর মূল বার্তা হলো হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা। তাঁর দেখানো শান্তি, সম্প্রীতি, দয়া, ক্ষমা, সততা ও মানবপ্রেমের পথ অনুসরণ করাই হবে তাঁর প্রতি ভালোবাসার সর্বোত্তম প্রকাশ। শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, তাঁর সিরাত বা জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনকে সুন্দরভাবে সাজানোই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
আসুন, এই পবিত্র দিনে আমরা বিশ্বনবী (সা.)-এর প্রতি আরও বেশি দরুদ পাঠ করি এবং তাঁর জীবনাদর্শকে আঁকড়ে ধরে এক উন্নত ও শান্তিময় সমাজ গঠনে সচেষ্ট হই।
আরও দেখুন দরিয়া-ই-নূর, এক রহস্যময় হীরার গল্প – জানুন সম্পূর্ণ ইতিহাস



